ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও জোটের ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী জোটের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সরকার সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করলেও, সেই কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি বিরোধী দল। তাদের স্পষ্ট দাবি, সংবিধান সংশোধন নয়, বরং গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ওই আদেশ অনুসারে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করতে হবে। কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচজন প্রতনিধির নাম চাওয়া হলেও তারা নাম দেননি। সরকারের পক্ষ থেকে নাম আহ্বান করা হলেও তারা নাম দেয়নি।
২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট সই করে। কমিশনের কার্যক্রম শেষে মোট ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়, যার মধ্যে ৪৮টি বিষয়ের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। বাকি বিষয়গুলো নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। এছাড়া, নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ এই সংস্কার প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। অথচ সরকার এই জনমতের প্রতিফলন না ঘটিয়ে উল্টো সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৬ই জুন সংসদের এলডি হলে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানান, বিশেষ কমিটিতে তারা কোনো প্রতিনিধি দেবেন না। তার মতে, জনগণের মূল দাবি ছিল সংস্কার, আর সেই উদ্দেশ্যেই গণভোট আয়োজিত হয়েছিল। একই সুর শোনা গেছে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের কণ্ঠে। গত ২০শে সেপ্টেম্বর তিনি স্পষ্ট করেন, জনগণের ভোট কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবধার বিষয় নয়। সাংবিধানিক ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই অবস্থানে অটল রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শরিকরাও। গত ২০শে সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষ কমিটির মতবিনিময়েও জামায়াতসহ ১১ দল অংশ নেয়নি।
সংসদে ১২ সদস্যের বিশেষ এই কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কমিটির দায়িত্ব হলো জুলাই সনদের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা। সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, স্বাধীন রাষ্ট্রে নতুন করে সংবিধান পুনর্লিখন বা আলাদা সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন নেই; সংসদীয় ব্যবস্থায় সংশোধনী আনাই এক ধরনের সংস্কার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংসদে পেশ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কমিটি। তবে বিরোধী দল এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, সরকার পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। দলটির সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেননি। কমিটি নিয়ে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল: এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল বিএনপি ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো সংশোধনী গৃহীত হওয়াই এক ধরনের সংস্কার।
এনসিপি’র নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য ও মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, সরকার কেন আগের প্রক্রিয়াটিকে বাদ দিয়ে নতুন করে এই কমিটি গঠন করল, সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি। তার মতে, গণভোটের রায়কে পাশ কাটানোর কারণে এই সংশোধন প্রক্রিয়ার কোনো নৈতিক বৈধতা নেই। যদি সরকার এককভাবে কাজ সম্পন্ন করতে চায়, তবে তার রাজনৈতিক পরিণতিও তাদেরই বহন করতে হবে। এনসিপির দাবি, জনগণের রায়ের ভিত্তিতে ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ীই সংস্কার কাজ পরিচালনা করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি ও অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সরকার এখন তা থেকে সরে এসেছে। গণভোটের রায় কার্যকর না করে এভাবে সংবিধান সংশোধনের কমিটি করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এছাড়া, রাষ্ট্রীয় সংস্কারে যুক্ত বিভিন্ন দল ও জোটের প্রতিনিধিদের বিশেষ কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও জামায়াত, এনসিপিসহ ১১টি দল তাতে অংশগ্রহণ করেনি। আবার সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ ও বাসদ (মার্কসবাদী) সহ বেশ কিছু বামপন্থী দলকে আলোচনায় আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন ও জেএসডিও কমিটির কার্যক্রমে দ্বিমত পোষণ করে বৈঠকে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন








