চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়া

প্রকাশ:

পৃথিবীর বাইরের মহাকাশ অভিযানে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এখন চাঁদের বুকে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। এই দৌড়ে শামিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। নাসা ইতিমধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এমন এক পারমাণবিক চুল্লি তৈরির জন্য ঠিকাদারদের প্রস্তুতি নিতে বলেছে, যা দীর্ঘ সময় মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। সংস্থাটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি চাঁদে উৎক্ষেপণ করা। প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে এগিয়ে থাকতে নিজেদের পরিকল্পনাও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে নাসা। সঠিক নকশা হলে এগুলোতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপও খুব কম প্রয়োজন হবে। কিন্তু বড় আকারের চন্দ্রঘাঁটি গড়ে উঠলে আরো বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে রাশিয়া চীনের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘সেলেনা’ নামের একটি পারমাণবিক চুল্লি চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এই চুল্লিটি সর্বোচ্চ ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং কোনো ধরনের মানব সহায়তা ছাড়াই টানা এক দশক নিরবচ্ছিন্ন কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে; বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের সময়ে দেশটি মহাকাশ কক্ষপথে ৩০টিরও বেশি চুল্লি পাঠিয়েছিল। রাশিয়ার কুরচাটভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মিখাইল কোভালচুক দাবি করেছেন, মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই এবং এই প্রতিষ্ঠানটিই চন্দ্র চুল্লির নকশা করছে। এই তৎপরতার পেছনে রয়েছে মহাকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। সৌরশক্তির বিপরীতে পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলো ছাড়াই কাজ করতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে কম জায়গায় স্থাপন করা সম্ভব। নাসা ২০২৮ সালের ডিসেম্বরেই পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে একটি মহাকাশযানকে মঙ্গলগ্রহের দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

চন্দ্রপৃষ্ঠে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ এবং সেখান থেকে সৌরজগতের গভীরে অভিযান চালানোর জন্য পারমাণবিক শক্তিকে অপরিহার্য মনে করছে পরাশক্তিগুলো। কারণ, চাঁদের রাত পৃথিবীর হিসেবে প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়, যা সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা থামিয়ে দেয়। এছাড়া দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রা ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে মাইনাস ৩৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠানামা করে, যেখানে পারমাণবিক চুল্লিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য শক্তির উৎস হতে পারে। নাসা ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ নামক প্রকল্পের অধীনে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ক্ষমতাসম্পন্ন চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করেছে, যা অন্তত পাঁচটি বাড়ি সমতুল্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে এবং পাঁচ বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে। চাঁদের সম্পদ ও সেখানে প্রবেশের সুযোগ নিয়ন্ত্রণকে এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক এডউইন লাইম্যান মনে করেন, মহাকাশের প্রতিযোগিতায় পারমাণবিক শক্তির সংযোজন পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে রকেট উৎক্ষেপণের সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে রাশিয়ার মহাকাশ অভিযানের সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা এই ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে আসে।

পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি নির্বাচন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নাসা তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ‘হাই-অ্যাসে লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম’ (এইচএএলইউ) ব্যবহারের চিন্তা করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর মজুদ সীমিত। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি নিষিদ্ধ করায় জ্বালানি সরবরাহের সংকটে পড়েছে নাসা। এর আগে নাসার ২০১৮ সালের পরীক্ষামূলক চুল্লিতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়েছিল, যা নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতা ও পদার্থবিদ বিল ফস্টার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সামান্য প্রযুক্তি ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে এই জ্বালানিকে বিপজ্জনক অস্ত্রে রূপান্তরিত করার সুযোগ থেকে যায়।

চন্দ্র চুল্লির কার্যকারিতা ও অবতরণ প্রযুক্তি নিয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বর্তমানে এমন কোনো প্রমাণিত অবতরণযান নেই, যা ভারী এবং তেজস্ক্রিয় উপাদানসহ চাঁদের অসমতল পৃষ্ঠে নিরাপদে নামতে পারে। নাসা ও রাশিয়া উভয়ই আশ্বস্ত করেছে যে, চুল্লিগুলো উৎক্ষেপণের সময় ‘ঠান্ডা’ বা নিষ্ক্রিয় থাকবে, তবে কোনো দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। উপরন্তু, চুল্লির মেয়াদ শেষ হলে তা অপসারণ বা নিষ্ক্রিয় করার কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মেয়াদ শেষে তেজস্ক্রিয় অবশিষ্টাংশ চাঁদেই ফেলে রাখা হবে। কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে চুল্লির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধ্বংসাবশেষের বিস্তার রোধ করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। চাঁদের প্রাথমিক পর্যায়ের ঘাঁটিতে যন্ত্রপাতি সচল রাখা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রোভার বা যানবাহনে শক্তি সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি ও রেডিওআইসোটোপ শক্তি ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শেয়ার করুন