খাওয়ার পর চা পান: শরীরের জন্য কতটা নিরাপদ?

প্রকাশ:

দুপুর কিংবা রাতের ভরপেট খাওয়ার পর এক কাপ চা অনেকের কাছেই তৃপ্তির শেষ ধাপ। আড্ডা বা বিশ্রামের অনুষঙ্গ হিসেবে এটি অনেকেরই দীর্ঘদিনের অভ্যাস। তবে এই অভ্যাসটি কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত কিছু উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। চা পান করা মানেই যে ক্ষতিকর, তা নয়; বরং সমস্যা তৈরি হয় চা পানের সঠিক সময়ের অভাব থেকে।

আমাদের শরীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে আয়রন শোষণের ক্ষেত্রে। চায়ে বিদ্যমান ট্যানিন ও পলিফেনল জাতীয় উপাদান খাবারের আয়রন শোষণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। বিশেষ করে উদ্ভিদজাত খাবার, ডাল, শাকসবজি, শস্য এবং ডিমে থাকা ‘নন-হিম আয়রন’ শরীর সহজে গ্রহণ করতে পারে না যদি খাবারের পরপরই চা পান করা হয়। তবে মাংস, মাছ বা কলিজার মতো উৎস থেকে পাওয়া আয়রনের ওপর চায়ের প্রভাব তুলনামূলক কম। অর্থাৎ চায়ের ক্যাফেইন নয়, বরং এর ট্যানিন ও পলিফেনলই আয়রন ঘাটতির জন্য মূল দায়ী।

হজমের ক্ষেত্রেও সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চায়ের ক্যাফেইন ও ট্যানিন পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা থেকে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তির সৃষ্টি হতে পারে। যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য খাবারের পরপর চা পান করা অসুবিধাজনক হতে পারে। তবে আদা বা পেপারমিন্টের মতো হারবাল চা কারও কারও হজমে আরাম দিতে পারে। চায়ের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ক্যাটেচিন শরীরের জন্য উপকারী হলেও, এটি কখন পান করা হচ্ছে তা বিবেচ্য।

বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর জন্য খাবারের পরপর চা পান করা এড়িয়ে চলাই ভালো। আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন যারা, গর্ভবতী নারী, নিরামিষাশী বা ভেগান ডায়েট অনুসরণকারী, মাসিকের সময় নারীদের এবং শিশু-কিশোরদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এছাড়া যারা আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই সতর্কতা প্রয়োজন।

খাবার খাওয়ার পরপরই চা পান না করে সময়ের ব্যবধান বজায় রাখাই শ্রেয়। সাধারণভাবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পর চা পান করা সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। যাদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা রয়েছে, তারা এই বিরতি আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারেন। চায়ের ক্ষেত্রে গ্রিন টি বা হারবাল চা কালো চায়ের তুলনায় কম আয়রন শোষণে বাধা দেয়, তাই বিকল্প হিসেবে এগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে।

পরিশেষে, খাবারের সাথে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবু, টমেটো বা আমলকী রাখলে তা আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে। মাঝেমধ্যে খাবারের পর চা পান করলে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও নিয়মিত এই অভ্যাস শরীরের জন্য বিশেষ করে যারা আয়রন ঘাটতির ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই খাবারের শেষে একটু সময় অপেক্ষা করে চা পান করাই উত্তম। এই ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের ছোট বিরতি চায়ের স্বাদ ও শরীরের পুষ্টি—উভয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খাবার খাওয়া শেষ, এবার এক কাপ চা—অনেকের কাছেই যেন এ দুই বিষয় একে অন্যের পরিপূরক।

শেয়ার করুন